দেশের পর্যটননগরী কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক আকাশপথে যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-কক্সবাজার-মাসকাট এবং এয়ারএশিয়া কক্সবাজার-পেনাং রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করবে। পাশাপাশি দুবাই, ব্যাংকক, ফুকেট ও ভারতের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়েছে আরও কয়েকটি এয়ারলাইনস। এতে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সরাসরি কক্সবাজারে আসার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি দেশের পর্যটনশিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। তবে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে নিয়মিত ফ্লাইট, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া এবং মানসম্মত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। গত ২৫ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোও সবক’টি এয়ারলাইনসকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
গত ১২ অক্টোবর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির বিষয়টি উঠে আসে। সভায় সভাপতিত্ব করেন রশিদুজ্জামান মিল্লাত। এতে জানানো হয়, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দরটি থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন বলে সভায় জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে বিমানবন্দরে নতুন যাত্রী টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রানওয়ে মেরামতের কাজ শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য অফিসের স্থানও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পক্ষ থেকে সভায় জানানো হয়, আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বিমানবন্দরটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
সভায় আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় তৈরি বিভিন্ন অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা তুলে ধরা হয়। যাত্রীসেবা এবং আন্তর্জাতিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়েও উপস্থাপনা দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে বেবিচক সদস্য (এটিএম) মো. নূর-ই আলম আমাদের সময়কে বলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। প্রধানমন্ত্রী সময় দিলেই তার কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রথম ধাপে মাসকাট ও পেনাং: সভায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ঢাকা-কক্সবাজার-মাসকাট এবং মাসকাট-কক্সবাজার-ঢাকা রুটে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে একটি ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের গন্তব্যে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, এয়ারএশিয়া কক্সবাজার-পেনাং এবং পেনাং-কক্সবাজার রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করবে বলে সভায় জানানো হয়। এর ফলে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের সঙ্গে কক্সবাজারের সরাসরি আকাশ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দুবাই-ফুকেটসহ আরও রুটে আগ্রহ: কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহের কথা জানিয়েছে ফ্লাই দুবাই। সংস্থাটির প্রতিনিধি সভায় জানান, দুবাই-ব্যাংকক-কক্সবাজার এবং কক্সবাজার-ব্যাংকক-দুবাই রুটে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে কক্সবাজার-ফুকেট ও ফুকেট-কক্সবাজার রুটেও ফ্লাইট পরিচালনার কথা তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া এয়ার অ্যাস্ট্রা কক্সবাজার থেকে ভারতের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস।
পর্যটক আকর্ষণে বিশেষ প্যাকেজের প্রস্তাব: কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে এয়ারপোর্ট অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। সংগঠনটির প্রতিনিধি সভায় বলেন, দেশি-বিদেশি পর্যটক ও এয়ারলাইনসকে আকৃষ্ট করতে হোটেল এবং বিমানভাড়ার সমন্বয়ে বিশেষ প্যাকেজ, সুবিধা ও ছাড় দেওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে যাত্রীর সংখ্যা বাড়তে পারে। উপস্থিত অন্যান্য এয়ারলাইনসের প্রতিনিধিরাও এ প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় এয়ারলাইনসগুলোকে আকৃষ্ট করতে একটি ধারণাপত্র তৈরি করা হবে। এতে সম্ভাব্য পর্যটক চাহিদা, সমন্বিত পর্যটন প্যাকেজ এবং বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতের উন্নয়ন কৌশল পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে এয়ারলাইনসগুলোকে কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা দ্রুত মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা: কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের সরাসরি যাতায়াতের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি আকাশ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে পর্যটক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের যাতায়াত সহজ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কক্সবাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু উদ্বোধন বা ফ্লাইট চালু করাই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা, যাত্রী চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রুট নির্ধারণ, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া এবং পর্যাপ্ত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
Leave a Reply