1. tasermahmud@gmail.com : admi2017 : US Bangladesh
  2. akazadjm@gmail.com : Taser Khan : Taser Khan
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ন

ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত প্রতিবেশী দেশগুলো

‍ইউএস বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ার কালিমানতান, পাপুয়া ও সুমাত্রা অঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। বাতাসের সঙ্গে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই ধোঁয়াশায় শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথাসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা। একই সঙ্গে পরিস্থিতি ঘিরে দেশগুলোর মধ্যে বাড়ছে কূটনৈতিক টানাপোড়েন। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদন এ তথ্য জানা যায়।

নাগরিকদের ক্ষোভ সামাল দেওয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সরকার।

সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইউজিন ট্যান বিবিসিকে বলেন, মানুষ বিরক্ত, ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। সরকারগুলোকে এই পরিস্থিতিতে সাড়া দিতে হবে, তা না হলে বাইরের একটি সমস্যা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ায় প্রতিবছরই দাবানলের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে পাম তেলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য বড় আকারে বনভূমি পরিষ্কার করতে গিয়ে এসব আগুনের সূত্রপাত হয় বলে মনে করা হয়। তবে এ বছর শক্তিশালী এল নিনোর কারণে দেশটির বনাঞ্চল ও পিটল্যান্ডে খরা পরিস্থিতি তীব্র হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আগের বছরগুলোতে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় এমন ধোঁয়াশা সাধারণত কয়েক দিন স্থায়ী হলেও এবার তা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে।

মালয়েশিয়ায় ইন্দোনেশীয় পণ্য বয়কটের ডাক

দাবানলের ধোঁয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে মালয়েশিয়ার নাগরিকদের একাংশ ইন্দোনেশীয় পণ্য বয়কটের ডাক দিয়েছেন। দেশটির আইনপ্রণেতা সাইয়েদ সাদিক দাবানলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান। এসব প্রতিষ্ঠানকে আঞ্চলিকভাবে একঘরে করারও দাবি তোলেন তিনি।

অন্যদিকে সিঙ্গাপুরেও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশটির নাগরিকদের প্রত্যাশা, সরকার জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

ইউজিন ট্যান বলেন, এল নিনোর তীব্রতা সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্কতা থাকলেও ধোঁয়াশা মোকাবিলায় সরকার যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারেনি এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। দূষণ সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন সিঙ্গাপুরের নাগরিকেরা।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিঙ্গাপুর সরকার দ্বীপজুড়ে শত শত আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেছে। শিশু, বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ধোঁয়াশা মোকাবিলায় বিদ্যমান আইন আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ১০টি কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

গ্যাস রপ্তানি কমানোয় নতুন উত্তেজনা

ধোঁয়াশা নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনার মধ্যে গত সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে জাকার্তায় বৈঠক করেন সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণন। বৈঠককে তিনি ‘খোলামেলা’ ও ‘আন্তরিক’ আলোচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। দুই দেশ ধোঁয়াশা মোকাবিলায় একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনেরও ঘোষণা দেয়।

তবে এর মধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। তিনি বলেন, দাবানল মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং প্রতিবেশী সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় অক্সিজেনের জোগানও আসে ইন্দোনেশিয়ার বন থেকে।

মন্তব্যটিকে হতাশাজনক ও অনুচিত বলে সমালোচনা করেন সিঙ্গাপুরের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী কে শানমুগাম। তিনি বলেন, ধোঁয়াশা দুই দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। তাই এ সমস্যা সমাধানে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ তৈরি করা উচিত নয়।

এর কয়েক দিন পরই ইন্দোনেশিয়া সিঙ্গাপুরে গ্যাস রপ্তানি কমানোর ঘোষণা দেয়। অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদার কথা উল্লেখ করে দেশটি এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়। অনেকের ধারণা, ধোঁয়াশা নিয়ে সিঙ্গাপুরের সমালোচনার জবাব হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

যদিও সিঙ্গাপুর জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ কমানোর পরিমাণ তাদের দৈনিক মোট চাহিদার ২ শতাংশেরও কম। ফলে এতে দেশটির জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।

কূটনৈতিক পদক্ষেপেই সমাধান খুঁজছে মালয়েশিয়া

সিঙ্গাপুরের তুলনায় মালয়েশিয়া এ বিষয়ে অনেকটা সংযত অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহামাদ হাসান ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তার মতে, এমন পদক্ষেপের অর্থ হবে দুই দেশের সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া।

পরিবর্তে দাবানল প্রতিরোধে সহযোগিতা বাড়াতে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া।

এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের আন্তসীমান্ত ধোঁয়াশা দূষণবিষয়ক চুক্তির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি। ২০০৩ সালে কার্যকর হওয়া এই চুক্তিতে সদস্যদেশগুলো ধোঁয়াশা মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছিল।

তবে চুক্তিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দাবানলের জন্য দায়ী কৃষি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নেই এর। এমনকি সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোকে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করারও সুযোগ নেই।

তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এশীয় অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক জেমস চিনের মতে, ধোঁয়াশা দূষণবিষয়ক আসিয়ান চুক্তি কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ধোঁয়াশা কমে গেলে এবং রাজনৈতিক চাপ শেষ হলেই আবার আগের মতো পরিস্থিতি ফিরে আসে।

২০১৬ সালে আসিয়ান দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে আঞ্চলিক ধোঁয়াশা দূর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। নির্ধারিত সময়ে সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় পরে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল করা হয়।

পাম তেল উৎপাদনও বড় বাধা

মালয়েশিয়ার জন্য বিষয়টি আরও জটিল, কারণ দেশটিও বিশ্বের অন্যতম প্রধান পাম তেল উৎপাদনকারী। বাণিজ্যিকভাবে জমি পরিষ্কারের জন্য গাছপালা পুড়িয়ে ফেলার পদ্ধতি বা ‘স্ল্যাশ অ্যান্ড বার্ন’ চর্চার সঙ্গে এই শিল্পের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

মালয়েশিয়াও বিভিন্ন সময়ে নিজস্ব ভূখণ্ডের দাবানল থেকে সৃষ্ট ধোঁয়াশায় আক্রান্ত হয়েছে। ২০১৯ সালে দেশটি আঞ্চলিক ধোঁয়াশার জন্য ইন্দোনেশিয়ার পিটল্যান্ডের দাবানলকে দায়ী করলে ইন্দোনেশিয়া পাল্টা অভিযোগ করে, ধোঁয়া মালয়েশিয়ার দিক থেকেই আসছে।

মালয়েশিয়ার প্যাসিফিক রিসার্চ সেন্টারের প্রধান উপদেষ্টা এই সান ওহ বলেন, পাম তেল উৎপাদনকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলে ধোঁয়াশার সমস্যা বারবার ফিরে আসবে।

তার মতে, ইন্দোনেশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের যে প্রভাব রয়েছে, মালয়েশিয়ার তা নেই। কারণ সিঙ্গাপুর ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং দেশটির বহু ধনীর সম্পদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অফশোর আর্থিক কেন্দ্র।

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত ইন্দোনেশিয়াকে সরাসরি চাপে ফেলতে চাইছে না মালয়েশিয়া। বরং বাতাসের গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে ধোঁয়াশা কমে আসার অপেক্ষায় রয়েছে দেশটির সরকার।

তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দাবানলের মূল কারণ বন উজাড়, কৃষি সম্প্রসারণ ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দূর করা না গেলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতিবছরই এমন পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সংকট ফিরে আসবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019-2023 usbangladesh24.com