যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচ কাউন্টিতে বাহামাগামী একটি লিয়ারজেট বিমানবিধ্বস্ত হয়েছে। রোববার বিকেলের এ দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা নয়জনের সবাই নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। মার্কিন বার্তাসংস্থা সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের (এনটিএসবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশটিতে এটি দ্বিতীয় প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা। এর আগে গত জুনে মিসৌরির বাটলারে একটি স্কাইডাইভিং উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ১২ জন নিহত হয়েছিলেন।
দুর্ঘটনায় নিহত নয়জনের পরিচয় এখনো প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। বিমানটিতে কতজন যাত্রী ও কতজন ক্রু ছিলেন, তা-ও নিশ্চিত করা হয়নি।
ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস দুর্ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, বিমানটিকে নিচে নেমে আসার সময় ক্ষেপণাস্ত্রের মতো দেখাচ্ছিল। তবে মাটিতে থাকা কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার কারণে উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষ বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একটি মোবাইল হোম পার্কে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানকার প্রায় ৬০০ বাসিন্দার আশ্রয় সংকট দেখা দিয়েছে। তাদের কাউন্টির দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তা জোয়েল ফ্লোরেস।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি এ ঘটনাকে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) ও এনটিএসবি তদন্ত শুরু করেছে। রোববার ও সোমবার তদন্তকারীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সোমবার এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনও হওয়ার কথা রয়েছে।
এফএএর তথ্য অনুযায়ী, লিয়ারজেট ৬০ মডেলের উড়োজাহাজটি টেক্সাসের অস্টিন-বার্গস্ট্রম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাহামার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। ডেলাওয়্যারের একটি সীমিত দায় কোম্পানির নামে নিবন্ধিত উড়োজাহাজটি অনলাইনে চার্টার ফ্লাইটের জন্যও ভাড়া দেওয়ার তালিকায় ছিল।
বিমান চলাচলসংক্রান্ত রেকর্ড অনুযায়ী, লিয়ারজেট ৬০ মডেলের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। এর আগে ২০০৮ সালে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার কলম্বিয়া থেকে উড্ডয়নের সময় লস অ্যাঞ্জেলেসগামী একটি লিয়ারজেট ৬০ বিধ্বস্ত হয়ে চারজন নিহত হয়েছিলেন।
দুর্ঘটনার আগে বিমানে বরফ জমার তথ্য দেন পাইলট
বিমান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সঙ্গে পাইলটের কথোপকথনের রেকর্ডিং অনুযায়ী, দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগে উড়োজাহাজটির গায়ে বরফ জমার কথা জানিয়েছিলেন পাইলট। সে সময় বাইরের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পাশাপাশি মাঝারি মাত্রার বায়ু-ঝাঁকুনির কারণে উড়োজাহাজটি প্রায় ৭০০ ফুট পর্যন্ত ওঠানামা করছিল।
পাইলট মায়ামি এয়ার রুট ট্রাফিক কন্ট্রোল সেন্টারকে জানান, উড়োজাহাজে হালকা মাত্রার স্বচ্ছ বরফ জমেছে, যা তখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল। তবে কিছুক্ষণ পর বৃষ্টিপাত শুরু হলে তিনি উড়োজাহাজটির উচ্চতা বাড়ানোর অনুরোধ জানান।
এরপরই জরুরি পরিস্থিতির ঘোষণা দেন পাইলট। রেডিও বার্তায় তাকে বলতে শোনা যায়, উড়োজাহাজটি দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে এবং প্রতি মিনিটে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার ফুট পর্যন্ত অবতরণের গতি পৌঁছেছে। একপর্যায়ে তিনি বলেন, উড়োজাহাজটি মাটিতে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট এডিএস-বি এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি মাত্র এক মিনিটে প্রায় ২৭ হাজার ফুট উচ্চতা হারায়। এরপর এর গতিবিধি শনাক্ত করার তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার সময় ওই এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে বজ্রঝড় হচ্ছিল। নিচে নামতে শুরু করার কয়েক মিনিট আগে উড়োজাহাজটি একটি শক্তিশালী ঝড়ের মধ্য দিয়েও যায়। তবে ঝড়ের সঙ্গে দুর্ঘটনার সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই এলাকায় বজ্রঝড় ও উড়োজাহাজ চলাচলের ঝুঁকি নিয়ে আগে থেকেই সতর্কতা জারি করেছিল এফএএ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উড়োজাহাজের ডানা ও অন্যান্য পৃষ্ঠে বরফ জমলে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এনটিএসবি এক নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় জানিয়েছিল, উড্ডয়ন অবস্থায় বরফ জমলে উড়োজাহাজের গতি ও চলাচলের পথ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক উচ্চতায় উড়তে ব্যর্থ হতে পারে।
তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ব্ল্যাক বক্স
দুর্ঘটনাস্থলের সড়কে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে এবং রাস্তার একটি অংশ বেঁকে গেছে। উড়োজাহাজটি পাম বিচ কাউন্টির মিলিটারি ট্রেইল এলাকায়, ক্রেস্টহেভেন বুলেভার্ড ও টেনথ অ্যাভিনিউ নর্থের মধ্যবর্তী স্থানে আছড়ে পড়ে।
দুর্ঘটনার পর মিলিটারি ট্রেইলের উত্তর ও দক্ষিণমুখী সব লেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চালকদের ওই এলাকা এড়িয়ে বিকল্প পথ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সিএনএনের বিমান চলাচল বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন বিভাগের সাবেক মহাপরিদর্শক মেরি শিয়াভো বলেছেন, দুর্ঘটনার সময় ধারণ করা ড্যাশক্যামের ভিডিও তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। তার মতে, উড়োজাহাজটির অস্বাভাবিক দ্রুতগতির নিম্নমুখী পতন নিয়ন্ত্রণ হারানোর ইঙ্গিত দেয়।
তবে বিস্ফোরণে ফ্লাইট রেকর্ডার বা ব্ল্যাক বক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। উড়োজাহাজটিতে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার ছিল কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই রেকর্ডার থাকলে দুর্ঘটনার আগে পাইলটদের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে কারণ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
Leave a Reply