1. tasermahmud@gmail.com : admi2017 : US Bangladesh
  2. akazadjm@gmail.com : Taser Khan : Taser Khan
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৭ পূর্বাহ্ন

‘সময় গেলে সাধন হবে না’

বাছির জামাল
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট এ ডাল (১৯১৫-২০১৪) বিরোধী দলের ভূমিকা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলগুলো সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা (oversight), পরবর্তী নির্বাচনে বিকল্প তুলে ধরা (alternative) এবং মাঝে মাঝে নীতিগত লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা (cooperation) করার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে (পলিটিক্যাল অপজিশনস ইন ওয়েস্টার্ন ডেমোক্রেসিস, নিউ হ্যাভেন: ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস, ৩৩২-৪৭)।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডালের এই পর্যবেক্ষণ পশ্চিমা সরকারগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে করা হলেও, বিশ্বের অন্য সরকারগুলোর ক্ষেত্রেও তা সমানভাবে প্রযোজ্য বলে মনে করি।

একটি লম্বা সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অদলবদল করে সরকার আর বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখা গেছে বিএনপি আর আওয়ামী লীগকে। বিতর্কিত তিনটি সংসদের ‘তথাকথিত’ প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল জাতীয় পার্টি, কিন্তু তাদের এ ভূমিকা চিরাচরিত বিরোধী দলের কাজ কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ইতিহাসের সর্বোচ্চসংখ্যক আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলে হিসেবে সংসদে যায় জামায়াতে ইসলামী। ধর্মীয় এই দলটি ত্রয়োদশ নির্বাচনে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে এবং জোটের আসনসহ মোট ৭৭টি আসন নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে। জামায়াতের ইতিহাসে এটিই সংসদে সর্বোচ্চ আসন প্রাপ্তি।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা সরকারের অন্ধ বিরোধিতা করবে না; বরং সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করবে এবং ভুল ও জনবিরোধী নীতির যৌক্তিক সমালোচনা বা বিরোধিতা করবে। তবে এরই মধ্যে নবীন এই বিরোধী দলের প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞা, সংসদীয় কার্যক্রমে পারদর্শিতা এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা আলোচনা শুরু করছেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির যে সরকার বর্তমানে দেশ পরিচালনা করছে, তা গঠন হয়েছে মাত্র সাত মাস আগে। কিন্তু এই সরকার গঠনের ছয়মাস যেতে না যেতেই প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী তার ১১ দলীয় জোটকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছে। আট দফা দাবি বলা হলেও মূলত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসনের দাবিতে এরই মধ্যে তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছে। আগামী ৩১ অক্টোবর রয়েছে ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়ার দিকে লংমার্চ। তারপর ঢাকা-সিলেট অভিমুখে লংমার্চ, যার তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। এর পরই ঢাকায় মহাসমাবেশ করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে জামায়াত জোট।

এরই মধ্যে জামায়াত ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা থেকে রংপুর যাওয়ার পথে গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে এক পথসভায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আট দফা দাবি না মানলে একদফার আন্দোলনে যাবেন তারা। অর্থাৎ সরকার পতনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েও রাখলেন তারা।

স্মরণে থাকার কথা, এই লংমার্চ শুরু হওয়ার আগে জামাতের আমির রাজধানী মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাস ভবনে জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে সম্পাদকরা সংসদকে সবকিছু কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তারা আরও বলেছিলেন, রাজপথে যাতে এমন কোনো কর্মসূচি দেওয়া না হয়, যার দ্বারা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়।

এটা কে না জানে যে, সংসদকে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার বিষয়টি জুলাই গণঅভ্যুত্থানেরও আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু এসবের ভ্রূক্ষেপ না করে জামায়াত ও তার জোট রাজপথে আন্দোলন শুরু করে এবং উপরন্তু একদফার আন্দোলন শুরুর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জামায়াত জোট যেসব দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে নেমেছে, তার অধিকাংশই সরকারসৃষ্ট কোনো সমস্যা নয়, এর সমাধান আপাতত সরকারের হাতেও নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বেই জ্বালানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে এ সংকট থেকে পরিত্রাণেরও কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, যদি না ওই তিন রাষ্ট্রের যুদ্ধ শেষ হয়। তারপরও সরকার এ সংকট মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর দরুন বিদ্যুৎ-গ্যাস ও তেলের সমস্যা থাকলেও তা সহনীয় পর্যায়ে বলা যায়।

অনেকেই মনে করেন, এই রকম অবস্থায় জামায়াত ও তার জোট মাঠের কর্মসূচি না দিলেও পারত। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার কী করতে পারে, তার জন্য বিকল্প প্রস্তাব দিতে পারত, কিংবা সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেই উদ্যোগকে কার্যকর করার জন্য আরও কী করা যায়, তার পরামর্শ দিতে পারত।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মাঠের কর্মসূচি দেওয়া যে কোনো রাজনৈতিক দলের অধিকারের মধ্যেই পড়ে। বিরোধী দল অবশ্যই সরকারি কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করবে, প্রয়োজনে কর্মসূচিও দেবে, এতে দোষের কিছু দেখি না। তবে কখন কর্মসূচি দিতে হবে, আর কখন দিতে হবে না, তা রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এ ছাড়া এসব বিষয় বুঝতে পারাটাও একটি রাজনৈতিক দলের দক্ষতা বটে। জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান কর্মসূচি হয়েছে ওই ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার’ মতো অবস্থা। এজন্য একটি সরকারের ‘মধুচন্দ্রিমা-সময়’ পাড় হওয়ার আগেই মাঠে নেমে যাওয়াটা ঠিক হয়নি বলেই মনে হয়।

আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার ব্যাপারে জামায়াতের তরফে অনেক যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা বলেছে, গণভোটের রায় এখনো কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নেই, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হয়নি, বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী তাদের ২৬ শতাংশ সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হয়নি ইত্যাদি। এসব বিষয় নিয়ে সরকারি দলের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বেড়েছে।

তবে এসব ইস্যুর যৌক্তিকতা থাকলেও জামায়াত জোট এখনই এ নিয়ে কর্মসূচি না দিলেও পারত। এসব ইস্যু নিয়ে সংসদেই সরব থাকা উচিত ছিল, সরকারকে আরও যৌক্তিক সময় দিতে পারত। এ সময়ের মধ্যে এসব দাবি মানা না হলে তখন আন্দোলনে যাওয়াটা হতো যৌক্তিক।

যারা রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন, তারা মনে করেন, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দ্বিধাবিভক্ত সমাজ ও একটি অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পেয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান সহসা করতে না পারলেও ন্যূনতমপক্ষে সঠিক লাইনে আনতেও সরকারের জন্য মোটামুটিভাবে একটি লম্বা সময়ের দরকার। তা ছাড়া বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা ছাড়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এসব সমস্যার মোকাবিলা করা দূরূহই বটে! যদি এসব সমস্যার সমাধান না করা যায়, তাহলে ফ্যাসিবাদ ও তার দোসররা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠতে সময় লাগবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় নজর দিলে বোঝা যায়, ফ্যাসিবাদ ও তার দোসররা এ লক্ষ্যে একাট্টা হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে একটি সুরই তুলতে চাচ্ছে যে, ‘আগেই ভালো ছিলাম’।

সুতরাং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষশক্তিগুলোর সময় থাকতে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। নইলে পস্তাতে হবে একসময়।

লেখক: ব্যবস্থাপনার পরিচালক, বাংলাদেশে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট ও সিনিয়র সহকারী মহাসচিব: বিএফইউজে

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019-2023 usbangladesh24.com