দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে আবারও সক্রিয় হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে এবং অনুসন্ধান বা তদন্তের স্বার্থে গ্রেপ্তারের প্রয়োজন হলে মামলা দায়েরের আগেও আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি। বিশেষ করে যেসব অভিযুক্ত প্রভাব বিস্তার, তথ্য-প্রমাণ নষ্ট কিংবা অর্থ-সম্পদ সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে পারেন, তাদের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ঘুষ গ্রহণের সময় হাতেনাতে কর্মকর্তাদের ধরতে ফাঁদ মামলা পরিচালনা এবং নিয়মিত মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারেও তৎপরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব উদ্যোগে আসামি গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে দুদকের যে নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে, তা কাটিয়ে উঠতেই এই পদক্ষেপ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইনের নির্ধারিত শর্ত পূরণসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে।
দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রয়োজন অনুসারে আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে কমিশনের নির্দেশনা রয়েছে। অতীতে যেভাবে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে সক্রিয় ভূমিকা রাখত দুদক, বিগত কয়েক বছরে সেই তৎপরতা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তবে উচ্চপর্যায় থেকে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা থাকায় এখন গ্রেপ্তারে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন অনুসন্ধান ও তদন্ত কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গ্রেপ্তারকে কোনোভাবেই নিয়মিত বা নির্বিচার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং অভিযোগের ধরন, প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ, অনুসন্ধান বা তদন্তের স্বার্থ এবং অভিযুক্তের কারণে তদন্ত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আইনগত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুদকের এই তৎপরতার সাম্প্রতিক উদাহরণ মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে অগ্রণী ব্যাংকের গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধান। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের আগেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন। অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পর অভিযোগের বিষয়ে মামলা দায়েরের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ শাখার তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত সুদের প্রলোভন দেখিয়ে, ভুয়া এফডিআর তৈরি, চেক জালিয়াতি, ভুয়া ডিপোজিট স্লিপ ব্যবহার এবং ব্যাংক হিসাবের তথ্য পরিবর্তনের মতো কৌশলে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক।
দুদক জানায়, ৯১ জন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের প্রায় ৮ কোটি ৯৪ লাখ ৮০ হাজার ৮২৬ টাকা আত্মসাতের তথ্য-প্রমাণ পেয়ে গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকের শ্রীনগর শাখায় স্থানীয় থানা-পুলিশের সহযোগিতায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলা দায়েরের আগেই অনুসন্ধানের প্রয়োজনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এই ঘটনা দুদকের গ্রেপ্তার-তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কোনো অভিযোগে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পর অভিযুক্তদের কারণে অনুসন্ধান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে আইনসম্মতভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
দুদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে তিন শতাধিক মামলা করেছে সংস্থাটি। এসব মামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। একই সময়ে দুই শতাধিক মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে, যেখানে আরও প্রায় ৬০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। কমিশনে বর্তমানে অনুসন্ধান ও তদন্তাধীন অভিযোগ এবং মামলার সংখ্যা কয়েক হাজার। এসব ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
তবে মামলা ও অনুসন্ধানের তুলনায় নিজস্ব উদ্যোগে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে দুদকের তৎপরতা দীর্ঘদিন ধরে সীমিত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে কোনো অভিযুক্ত অন্য মামলায় পুলিশ বা অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুদকের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আইনি পরিভাষায় এটি ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ নামে পরিচিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তিন শতাধিক সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে আগে অন্য মামলায় আটক হওয়ার পর দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছেন।
দুদকের অতীতের পরিসংখ্যান বলছে, এক সময় দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে সংস্থাটির উল্লেখযোগ্য তৎপরতা ছিল। ২০১৬ সালে ৩৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করে দুদক। ২০১৭ সালে ১৮২, ২০১৮ সালে ৫৬ এবং ২০১৯ সালে ১২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ২০২০ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৯ জনে। ২০২১ সালে গ্রেপ্তার করা হয় ৩১ জনকে। পরবর্তী বছরগুলোতে নিজস্ব উদ্যোগে গ্রেপ্তারের তৎপরতা আরও সীমিত হয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুদকের গ্রেপ্তার কার্যক্রম ও হাজতখানা পরিচালনা নিয়ে বক্তব্য দেন। ওই দিন তিনি বলেছিলেন, গ্রেপ্তারের প্রয়োজন হলে দুদককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে। দুদকের নিজস্ব হাজতখানা তৈরি করে আসামি সেখানে রাখার বিষয়েও আপত্তি জানান তিনি।
অথচ দুদক আইনে আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে সুর্নিদিষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের কারণে দুদকের নিজস্ব চেষ্টায় আসামি গ্রেপ্তার অনেকটা সীমিত হয়ে পড়েছিল।
দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট কয়েক কর্মকর্তার মতে, ওই বক্তব্যের পর আসামি গ্রেপ্তার ও নিজেদের ব্যবস্থাপনায় হেফাজতে রাখার ক্ষেত্রে সংস্থাটির তৎপরতা কমে আসে। যদিও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের স্বার্থে গ্রেপ্তারের আইনি ক্ষমতা দুদকের রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২০ ধারায় কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ধারার অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তফসিলভুক্ত অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। তবে এ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে আইনের নির্ধারিত সীমা ও শর্তের মধ্যে।
আইনের ২১ ধারায় বিশেষ পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তারের ক্ষমতার বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তির নিজের বা অন্যের নামে থাকা স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে এবং অনুসন্ধানের প্রয়োজনে গ্রেপ্তার আবশ্যক হলে, আইন অনুযায়ী কমিশনের অনুমোদন নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধানের শর্ত পূরণ এবং প্রযোজ্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ জরুরি।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা মামলার আসামিকে গ্রেপ্তারের আগে কমিশনের অনুমোদন নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে গ্রেপ্তার প্রয়োজন কিনা, তা নির্ধারণে অভিযোগের গুরুত্বের পাশাপাশি অনুসন্ধান ও তদন্তের স্বার্থ বিবেচনা করা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, গ্রেপ্তারের ক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তি, প্রয়োজনীয়তা ও যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সময় ২০১৭ সালে গ্রেপ্তার কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে নিজস্ব হাজতখানা গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি গ্রেপ্তার কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ২০ সদস্যের একটি সশস্ত্র পুলিশ ইউনিট দুদকে যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিজস্ব উদ্যোগে গ্রেপ্তারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় হাজতখানাটি অনেকটা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তাদের মতে, অনুসন্ধান ও তদন্তে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ, প্রয়োজনীয় নথি উদ্ধার এবং আলামত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার না করলে অনুসন্ধান বা তদন্তের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
দুদকের জনসংযোগ শাখার প্রধান আকতারুল ইসলাম বলেন, অনুসন্ধান কিংবা তদন্ত কর্মকর্তা যদি তার তদন্তের প্রয়োজনে মনে করেন, যে দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, অর্থাৎ আসামি গ্রেপ্তারের প্রয়োজন রয়েছে, সে ক্ষেত্রে কমিশনকে অবহিত করে গ্রেপ্তার বিষয়ে তিনি পদক্ষেপ নিতে পারেন। গ্রেপ্তারের প্রয়োজন হলে কমিশনের অনুমতি পাচ্ছেন কর্মকর্তারা। বর্তমান কমিশন ঘুষ গ্রহণকালে যেকোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে (ফাঁদ মামলা) গ্রেপ্তার এবং নিয়মিত মামলার আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।
সাবেক জেলা জজ ও দুদকের লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন উইংয়ের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম মনে করেন, দুদক আইনেই কমিশনকে আসামি গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান বা তদন্তের প্রয়োজনে আইনসম্মতভাবে এ ক্ষমতা প্রয়োগ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, দুদকের একজন তদন্ত কর্মকর্তা আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সমপর্যায়ের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। অনুসন্ধান বা তদন্তের প্রয়োজনে আসামি গ্রেপ্তার করার দরকার হতে পারে। কর্মকর্তারা যদি এই ক্ষমতা প্রয়োগ না করেন, তাহলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজদের সাজা দেওয়ার লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে।
Leave a Reply