দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প থেকে উত্তোলিত পাথরের বিশাল মজুদ জমতে জমতে রীতিমতো ‘পাথরের পাহাড়’ তৈরি হয়েছে। দেশের একমাত্র এই পাথরখনি থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন পাথর উত্তোলন করা হলেও ক্রেতার অভাবে পরিস্থিতি ক্রমশ সংকটময় হয়ে উঠছে। এ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে খনিটি বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। আর বন্ধ হয়ে গেলে এই খনির সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত সহস্রাধিক শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়বেন। অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতি হবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির।
মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি চত্বরে পাথরের স্তূপ দেখলে মনে হবে ছোট ছোট টিলা। খনিসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১১ এপ্রিলের হিসাব মতে খনির ২৩টি ইয়ার্ডে প্রায় ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৫০ টন পাথর মজুদ রয়েছে। যার বাজারমূল্য ৪২০ কোটি টাকার বেশি। উত্তোলন অব্যাহত থাকায় এবং বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় প্রত্যেক মাসে মজুদের পরিমাণ বাড়ছে। এতে খনির পরিচালন ব্যয় মেটাতে কর্তৃপক্ষকে আর্থিক চাপ ও দেনার দায়ে পড়তে হচ্ছে।
সূত্রমতে, রেলওয়ের বার্ষিক প্রয়োজন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন ৪০/৬০ পাথর এবং রুটিন কাজে প্রয়োজন প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টন। এই সাইজের পাথর খনি ইয়ার্ডে মজুদ রয়েছে ৯ লাখ ২০ হাজার টন। একই সঙ্গে বোল্ডার ৮০/১২০ সাইজ পাথর মজুদ রয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার টন। অথচ দেশে নদীশাসনের জন্য বার্ষিক প্রয়োজন ৩ লাখ ৭০ হাজার টন।
সূত্রটি বলছে, শুধু রেলওয়ে ও নদীশাসনের জন্য পাথরগুলো মধ্যপাড়া খনি থেকে নেওয়া হলে ইয়ার্ডে কোনো পাথর পড়ে থাকবে না। কিন্তু এসব প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য অধিকাংশ পাথর আমদানি করা হয় ভারত, ভুটান, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। ফলে দেশের একমাত্র পাথর খনিতে উত্তোলিত পাথরের বড় অংশই বিক্রি না হয়ে পড়ে থাকছে।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) সূত্র জানায়, খনিতে তিন শিফটে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে বিক্রি নেই বললেই চলে।
উত্তোলিত পাথর সরাসরি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয় না। পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন এমজিএমসিএল নির্ধারিত ডিলারদের মাধ্যমে এসব পাথর বিক্রি করে থাকে। বর্তমানে নিবন্ধিত ডিলারের সংখ্যা ১৬৫ জন হলেও নিয়মিত পাথর নিচ্ছেন মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ জন।
সূত্রমতে, পাথর বিক্রি কমে যাওয়ার পেছনে
রয়েছে কয়েকটি কারণ- পরিবহন খরচ বৃদ্ধি; কমিশন ও ভ্যাট: আগের ৫ শতাংশ কমিশনের জায়গায় এখন দেওয়া হচ্ছে ৩ শতাংশ, এর ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট কাটা হচ্ছে, এর ফলে ডিলারদের লাভ কমে যাওয়ায় তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন; প্রতিযোগিতা : আমদানি করা পাথর দামে সস্তা এবং ওজনে হালকা হওয়ায় ক্রেতারা সেদিকেই ঝুঁকছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি প্রকল্পে দেশীয় পাথর ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা জারি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া রেলওয়ে ও পাউবোর দ্রুত পাথর গ্রহণ, পাথরের মূল্য পুনর্নির্ধারণ, অতিরিক্ত শুল্ক/রয়্যালিটি প্রত্যাহার করে উৎপাদন উৎসাহিত করা, পরিবহন ব্যয় কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা এবং নীতিগত সমন্বয় ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ হতে পারে এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের পাথরের চাহিদা মেটাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহারে সরকারি ক্রয়নীতি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ডিএম জোবায়েদ হোসেন বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে পাথর বিক্রির উদ্যোগে কোনো খামতি নেই। চলতি মাসেও আমরা রেলওয়েসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি পাথর বিক্রির জন্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা সরকার একটু উদ্যোগ নিলে সরকারি রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৩-৭৪ সালে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নে এই খনি আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এর উন্নয়নকাজ উদ্বোধন করেন। ২০০৭ সালের ২৫ মে থেকে মাত্র ৫০০-৭০০ টন পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে এই খনি থেকে বাণিজ্যিকভাবে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। ওই সময় খনিটি অলাভজন প্রতিষ্ঠান থাকলেও ২০১৩ সাল থেকে খনির উৎপাদন ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে খনি থেকে পাথর উত্তোলন, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। এরই ধারাবাহিকতায় খনিটি বিগত দিনে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। কিন্তু জিটিসি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় পাথর উত্তোলন করলেও এমজিএমসিএল বিক্রিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রায় এক বছর আগে থেকে পাথরের মজুদ বাড়তে থাকে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দেশীয় পাথরের ব্যবহার বাড়ানো এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মধ্যপাড়া খনির এই সংকট দূর করা কঠিন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের একমাত্র পাথর খনির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
Leave a Reply