ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ার মধ্যে সৌদি আরবের দুটি বিমানবন্দরে হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। বুধবার দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
কর্তৃপক্ষের বিবৃতি অনুযায়ী, রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় একজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। আর আবহা বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলায় নিহত হয়েছেন দুজন, আহত হয়েছেন আরও ২৮ জন।
হামলা দুটির একটি বুধবার এবং অন্যটি মঙ্গলবার হয়েছে বলে জানানো হলেও কোন হামলাটি কোন দিনে হয়েছে, তা স্পষ্ট করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ।
হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন হুথিবিরোধী জোট পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। জোট বলেছে, এসব হামলা ‘শাস্তি ছাড়া থাকবে না’। বুধবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, সাদা, হোদেইদা, জাওফ ও মারিব প্রদেশে হুথিদের ৮০টির বেশি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে বুধবার ইয়েমেনের এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন দিয়ে হামলা চালায় হুথিরা। দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কায়রো থেকে আসা একটি ফ্লাইট অবতরণের কয়েক মিনিট আগে একটি ক্ষেপণাস্ত্র রানওয়ের কাছে আঘাত হানে। হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকার বাইরে ইয়েমেনের বিভিন্ন অংশের জন্য এডেন বিমানবন্দরটি প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশপথ।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে কয়েকটি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দাবি করেছে, রিয়াদের উত্তরে একটি হুথি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটির উৎক্ষেপণস্থল হুথি নিয়ন্ত্রিত সানায় শনাক্ত করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে জোটটি।
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক লড়াইয়ের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের এলাকা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন সীমিত হয়ে পড়ায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
চলতি সপ্তাহে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান সহায়তায় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দেব ও মোখা শহরের আশপাশে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। সেপ্টেম্বরে হুথিদের দখলে যাওয়া কৌশলগত এলাকাগুলো পুনর্দখলের লক্ষ্যেই এ অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রা কতটা টেকসই হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এ সংঘাত বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে ইয়েমেনের প্রায় ১২ বছরের পুরোনো যুদ্ধকে নতুন করে জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, সর্বশেষ দফার লড়াই শুরুর পর ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়েছে।
আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, মানুষ জীবন বাঁচাতে পালাচ্ছে, কিন্তু নিরাপদে যাওয়ার মতো জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। খাদ্য ও আশ্রয়ের প্রয়োজন বাড়তে থাকায় তিনি আরও অর্থ সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ইয়েমেনের কিছু এলাকায় প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে তিনটি পরিবার খাদ্যসংকটে রয়েছে।
এদিকে হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে। তুরস্ক মূলত প্রতিরক্ষামূলক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বলে দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক ও পাকিস্তান সম্প্রতি গঠিত জোটের আওতায় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সিরিয়াও বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা ও সিরিয়ার এক সামরিক কর্মকর্তা। সম্ভাব্য সহায়তার মধ্যে সৌদি ভূখণ্ড রক্ষায় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া অথবা সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর সঙ্গে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সেনা মোতায়েনের বিষয় রয়েছে। তবে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হুথিদের হামলার মুখে তারা সৌদি আরবের পাশে রয়েছে, কিন্তু গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী দেশের পুনরুদ্ধারই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
Leave a Reply