ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি, ঘুষ, হুমকি ও সহিংসতার অভিযোগ তুলেছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। বুধবার দলটি দাবি করেছে, আরব দলগুলো নির্বাচনের ফল ‘চুরি’ করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির কাছে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে দলটি। বার্তাসংস্থা দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
লিকুদ পার্টির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সন্ত্রাসবাদ ও ইহুদি রাষ্ট্রের বিলুপ্তিকে সমর্থনকারী আরব দলগুলো ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা, জালিয়াতি ও অবৈধ সফটওয়্যার ব্যবহারের মতো গুরুতর অপরাধের মাধ্যমে ইসরায়েলের নির্বাচন চুরি করেছে।’ তবে এসব অভিযোগের পক্ষে দলটির দেওয়া দাবিগুলো এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
দলটি জানিয়েছে, পুলিশ, শিন বেত ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির কাছে শত শত সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নগদ অর্থ ও রা’আম দলের প্রতীকসংবলিত হাজার হাজার খাম, ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের হুমকি, ভোটকক্ষে একাধিক ব্যক্তির প্রবেশ, একাধিকবার ভোট দেওয়া এবং ভোটারসংখ্যা ও ব্যালটের খামের সংখ্যায় অসংগতির অভিযোগ রয়েছে।
লিকুদ এসব অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জানিয়েছে, তারা অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করছে।
কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিটি নির্বাচনের মতো এবারও নির্বাচনের স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণের কার্যক্রম চালু রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া নির্বাচনী অনিয়ম ও ফলাফলের সম্ভাব্য ভুলসংক্রান্ত অভিযোগগুলো পরীক্ষা করা হবে। নির্বাচনের দুই দিন আগে, ২৫ অক্টোবর, দলগুলোকে সন্দেহজনক ভোটকেন্দ্রের তথ্য জমা দেওয়ার পদ্ধতি জানানো হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেছে কমিটি।
নির্বাচনের ফলাফলে আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট দল দুটি ঐতিহাসিক সাফল্যের পথে রয়েছে। ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে জয়েন্ট লিস্ট ১২টি এবং রা’আম সাতটি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্মিলিতভাবে তাদের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ১৯, যা বর্তমান ১০ আসনের প্রায় দ্বিগুণ।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পেতে পারে। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে কোনো জোটই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কাছাকাছি নেই। এ পরিস্থিতিতে আরব দলগুলো সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী নেতৃত্বাধীন সরকারকে সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরাসরি ইসরায়েলি সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না তারা। গাজায় চলমান যুদ্ধ ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
জাবারিন বলেন, ইসরায়েলের জনগণ নতুন নেতৃত্বের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। নেতানিয়াহুর সরকারের বিকল্প হিসেবে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে চাইলে বিরোধী দলগুলোকে আরব দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতেই হবে।
রা’আম দলের নেতা মানসুর আব্বাসের দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ইয়োভ সেগালোভিৎসও জানিয়েছেন, তাদের দল পরবর্তী সরকারে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যিনিই দায়িত্ব পান, তাকে আরব ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিতে হবে।
ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টিই এখন পর্যন্ত আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। দলটির নেতা ইয়ার গোলান অন্য বিরোধী নেতাদের রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে সম্ভাব্য অংশীদারত্বের বিরোধিতা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
নির্বাচনের আগেই ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, নেতানিয়াহুর দল পরাজিত হলে আরব অধ্যুষিত এলাকার ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করে কারচুপির অভিযোগ তুলতে পারে। সে জন্য আগাম অভিযোগও প্রস্তুত করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের ফল নিয়ে লিকুদের অভিযোগ এবং আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অভিযোগগুলোর তদন্তের পাশাপাশি এখন নজর সরকার গঠনের আলোচনা ও বিরোধী দলগুলো আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে রাজি হয় কি না, সেদিকে।
Leave a Reply