দীর্ঘ ১০ মাসের বেশি সময় নির্বাসনে থাকার পর নিজ দেশ ভেনেজুয়েলায় ফিরেছেন বিরোধী নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। তবে তার প্রত্যাবর্তনের সময় দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে।
একসময় তার ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখন তার অংশগ্রহণ ছাড়াই ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। মার্কিন বার্তাসংস্থা সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাচাদো লেখেন, ‘ভেনেজুয়েলায়! একসঙ্গে! স্বাধীনতার জন্য!’ এ সময় তার গাড়ি ঘিরে উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের ভেনেজুয়েলার পতাকা ওড়ানো এবং আনন্দ-উল্লাসের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি।
পরে রাজধানী কারাকাসে পৌঁছানোর খবরও জানান মাচাদো। তাকে স্বাগত জানাতে সেখানে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক সমর্থক। সড়ক ও উড়ালসড়কে মানুষের ভিড় জমে যায়। অনেকে তার এক ঝলক দেখার আশায় উঁচু সড়কে উঠে পড়েন। রাতের অন্ধকারে অসংখ্য মুঠোফোনের ক্যামেরার আলোয় মুখর হয়ে ওঠে রাজধানী।
বারকিসিমেতো শহরে মাচাদোকে স্বাগত জানাতে আসা ৬৯ বছর বয়সী হারনান আদামেস রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা পুরো বিশ্বকে জানাতে চাই, মারিয়া কোরিনা মাচাদো ভেনেজুয়েলায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি ভেনেজুয়েলাকে উদ্ধার করবেন।’
ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দৃঢ় অবস্থানের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান মাচাদো। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান বিরোধী নেতা।
২০২৪ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে বেশির ভাগ সময় আত্মগোপনে ছিলেন মাচাদো। ওই নির্বাচনে সরকারনিয়ন্ত্রিত নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করে। তবে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে ঘোষিত ফলের পরিসংখ্যানগত বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
এরপরও ক্ষমতা ধরে রাখেন মাদুরো। শেষ পর্যন্ত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর এক অভিযানে তিনি আটক হন। তার ক্ষমতাচ্যুতির পর ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক পুনর্মিলন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা শুরু হয়।
কিন্তু সেই আলোচনায় মাচাদোকে কার্যত বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে তার দেশে ফেরা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ সরকারব্যবস্থা নির্ধারণে বিরোধী নেত্রী কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মাচাদোর দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না। তবে তার নিরাপত্তা নিয়ে তিনি আশাবাদী।
সিএনএনের সাংবাদিক জুলিয়া বেনব্রুক এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে আমার মনে হয়, তিনি খুব ভালো একজন নারী।’ মাচাদো তাকে নোবেল পুরস্কারটি দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি আর কী বলতে পারি? আশা করি, তিনি নিরাপদে আছেন।’
নিজ দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান মাচাদো। পুরস্কার গ্রহণের জন্য গত ডিসেম্বরে নরওয়েতে যান তিনি। এরপর আর দেশে ফিরতে পারেননি।
এক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত সরকারের সঙ্গে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও রাজনৈতিক পুনর্মিলনের বিষয়ে কাজ শুরু করে। এ প্রক্রিয়ায় বিরোধী শিবিরের আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাও যুক্ত হন।
বিরোধী জোটের হয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া দিনোরাহ ফিগুয়েরার মতে, মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতি এবং চলমান আলোচনার কারণেই মাচাদোর দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর আগে তাকে একাধিকবার দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার রাজনীতির সব পক্ষের স্বাধীনতা ও অধিকার যেন সম্মান করা হয়, তা নিশ্চিত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
রুবিওর ভাষায়, চলমান আলোচনায় সব রাজনৈতিক পক্ষের অংশ নেওয়া উচিত। গত ৩০ বছরের মধ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং দীর্ঘস্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এটিই ভেনেজুয়েলার সেরা সুযোগ।
মাচাদোর দল ভেন্তে ভেনেজুয়েলার আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক পরিচালক পেদ্রো উরুচুর্তু নোসেল্লি এক বিবৃতিতে বলেন, দেশে ফিরে আসার মাধ্যমে মাচাদো রাজনৈতিক উত্তরণকে এগিয়ে নিতে এবং নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি করতে চান।
মাচাদো আগেও একাধিকবার দেশে ফেরার অঙ্গীকার করেছিলেন। নতুন নির্বাচন হলে আবারও প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
মাচাদোর উপদেষ্টাদের দাবি, গত কয়েক মাসে তিনি সাতবার ভেনেজুয়েলায় প্রবেশের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
জুনের শেষ দিকে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুনর্গঠনকাজে সহায়তার উদ্দেশ্যে দেশে ফেরার চেষ্টা করেন তিনি। তবে তার অভিযোগ, সরকার আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়ে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়।
এরপর সেপ্টেম্বরে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে থাকাকালে আবারও দেশে ফেরার চেষ্টা করেন মাচাদো। কিন্তু এক দিনেই তিনবার তার প্রবেশের চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করা হয় বলে তার পক্ষ থেকে জানানো হয়।
গত ১ সেপ্টেম্বর রুবিও বলেছিলেন, মাচাদোর দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে। তবে তাকে দেশে ফেরার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির প্রয়োজন নেই।
রুবিওর ভাষায়, ‘ভেনেজুয়েলার নাগরিক হিসেবে মারিয়া কোরিনা মাচাদোর যখন ইচ্ছা নিজের দেশে ফেরার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।’ তবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
নির্বাসিত অবস্থায় গত ১০ মাসেরও বেশি সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরে নিজের রাজনৈতিক মিত্রদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন মাচাদো। তাদের মধ্যে ট্রাম্পও ছিলেন। এমনকি ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারটিও উপহার দেন তিনি।
তবে অতীতে মাচাদোর প্রতি সমর্থন জানালেও ভেনেজুয়েলার বর্তমান রাজনৈতিক উত্তরণ প্রক্রিয়ায় তাকে অনেকটাই পাশ কাটিয়ে চলেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
জানুয়ারিতে মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ট্রাম্প মাচাদোকে ‘খুব ভালো একজন নারী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে একই সঙ্গে দাবি করেন, দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনসমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা তার নেই।
এর পরিবর্তে মাদুরোর উত্তরসূরি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সরকারের সঙ্গে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের বিভিন্ন দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে রদ্রিগেজ সরকার শত শত রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে এবং দেশটিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশটির বিপুল জ্বালানি সম্পদ নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ রয়েছে।
আগস্টের শেষ দিকে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেলের মজুতের ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের বেশি অংশের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই উদ্যোগকে কেউ কেউ মার্কিন তেলশিল্প এবং ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি উভয়ের জন্যই সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন।
তবে এ চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাচাদো। এক ভিডিও বার্তায় তিনি জানতে চান, তার ভাষায় ‘অবৈধ শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে পরিচিত ভেনেজুয়েলার সরকার কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই তেল চুক্তি করছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনের পরও মাদুরো সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং এখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া দুটিই দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
Leave a Reply